Thursday, May 21, 2020

কুরআন-হাদীসের আলোকে তওবা: পরিচয়, প্রকরণ, গুরুত্ব ও ফজিলত

কুরআন-হাদীসের আলোকে তওবা: পরিচয়, প্রকরণ, গুরুত্ব ও ফজিলত
ধরার বুকে প্রতটিি মানুষই ইচ্ছায় বা অনচ্ছিায়, ভুল/পাপেরর সাথে সম্পৃক্ত। ভুল করা বা পাপ করা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। তাই আমাদরেও ভুল-ত্রুটি হওয়াটাই স্বাভাবকি। যা আমাদেরকে পাপ-পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত করে ফলে। কেননা কোন মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নয়। ভুল-ত্রুটি সংগঠিত হতেই পার। তবে উত্তম ঐ ব্যক্তিই, যে ভুল করার পর তওবা করে। মনে রাখতে হবে পাপ থেকে বেঁচে থাকা হলো মুমিনের পরচিয়। আর কৃতপাপ থেকে তওবা করা হলাে মুমিনের অনন্য বশৈষ্ট্যি।
মহান আল্লাহ তা‘আলার কাছে তওবা খুবই প্রিয়। তিনি তওবাকে মুমিনের সফলতা ও নাজাতরে চাবিকাঠি বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, কুরআনে তওবা করার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করনে-
‘হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তওবা কর। যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পার।’ {আন নূর: ৩১}
মহান আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেন-
‘তোমরা আল্লাহর নিকট আন্তরকিভাবে তওবা কর।’{আত-তাহরীম: ৮}
তওবাকারী ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ অত্যন্ত আনন্দিত হন। তাকে অনেক ভালোবাসেন। বান্দা যখন তার কৃতপাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তখন আল্লাহ অতি আনন্দিত ও খুশি হন। যেমন হাদীসে ইরশাদ হয়ছে-
হযরত আনাস ইবনে মালেক রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আল্লাহর রাসূল বলেছেন
‘কোন ব্যক্তি বিজন মরু প্রান্তরে উট হারিয়ে যাওয়ার পর পুনরায় তা ফেরৎ পেলে যে পরিমাণ আনন্দে উদ্বেলিত হয়, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবাতে এর চেয়েও বেশী আনন্দিত হন।’ {সহীহ বুখারী,হাদীস নং-৫৮৩৪}
অন্য এক হাদীসে এসছে-
আনাস ইবনে মালকে রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সা: বলেছেন: বান্দার তওবাতে আল্লাহ তোমাদের ঐ ব্যক্তির থেকে অধিক আনন্দিত হন, যে বিজন মরু প্রান্তরে তার উট হারিয়ে ফেলল। যাতে তার খাদ্য-পানীয় ছিল। উট হারানাের কারণে হতাশ হয়ে গাছের ছায়ায় এসে শুয়ে পড়লো। এমন পরিস্থিতিতে সে হঠাৎ দেখতে পেল তার উট তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছ। তখন সে উটের লাগাম ধরে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলতে লাগলো,“হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা আমি তোমার প্রভূ! অতি আনন্দরে কারণে সে এভাবে ভুল কথা বলে ফেলল।" {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৪৯৩৪}
উপরোক্ত হাদীসদ্বয় দ্বারা তওবার গুরুত্ব ও উপকারিতা খুব সহজেই বুঝা যায়।
তওবার পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: توبة (তওবাহ) শব্দটি (তওবুন) توب মূলধাতু হতে নির্গত। এর অভিধানগত র্অথ হল: অনুশোচনা, অনুতাপ, প্রত্যার্বতন, ক্ষমা, গোনাহ ছেড়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া ইত্যাদি।
পারিভাষিক অর্থ:
® মাজাল্লাতুল বুহুস আল ইসলামিয়্যাহতে এসেছে-
‘তওবা এমন লজ্জিত হওয়ার নাম যা দৃঢ় সংকল্প ও অভিপ্রায়ের উত্তরাধিকারী হয়। আর এই লজ্জিত হওয়াটা এমন জ্ঞানের উত্তরাধিকারী হয় যাতে পাপকাজ মানুষ ও তার প্রিয় ব্যক্তির মাঝে প্রতিবন্ধক হয়।’
® কেউ কেউ বলেন: ‘তওবা হলো হৃদয় থেকে মহান আল্লাহর দিকে বারংবার সর্ম্পক তৈরী করে প্রত্যার্বতন করা। অত:পর প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার সমস্ত হকের উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করা।’
® ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলেন: ‘তওবা হল আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতা থেকে তাঁর আনুগত্যেরর দিকে প্রত্যার্বতন করা।’
সুতরাং তওবা বলতে বুঝায় আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতা থেকে অনুতপ্তের সাথে প্রত্যার্বতন করে, কৃতর্কমের উপর লজ্জিত হয়ে, ভবিষ্যৎ জীবনে না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে প্রভূর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
আল-কুরআন ও হাদীসে তওবার র্বণনা: আল-কুরআন, হাদীস ও উম্মতের ঐক্যমতে প্রমাণিত হয় যে কৃতপাপ থেকে তওবা করা অপরিহার্য।
কুরআনের বহু স্থানে এ ব্যাপারে আলোচনা এসেছে তন্মধ্য হতে নিম্নে আমরা কয়েকটি আয়াত র্বণনা করবো। যেমন: আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ তা‘আলার নিকট তওবা কর, যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পারো।’ {আন নূর:৩১}
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে- ‘আর তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অত:পর তওবা কর।’ {হুদ: ৩}
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে – ‘আমি (নূহ আ:) বললাম, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর।’ {নূহ: ১০}
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র ইরশাদ করনে – ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর, বিশুদ্ধ তওবা।’ {আত-তাহরীম: ৮}
উপরোল্লেখিত আয়াতাবলীর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে তওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
 তওবার পূর্বে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা।
 আল্লাহ তা‘আলা বিশুদ্ধ তওবার নির্দেশ দিয়েছেন।
 তওবা ও ইস্তিগফার দুনিয়ার জীবনে প্রশান্তি লাভের মাধ্যম।
 উভয় জাহানে সফলতা লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়।
মহানবী (সা:) এর অসংখ্য হাদীসে তওবার বিষয় গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে। তন্মধ্য হতে নিম্নে কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করা হলো-
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
আবূ হুরাইরা রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সা: কে বলতে শুনেছি: আল্লাহর শপথ! আমি দিনের মধ্যে ৭০ বারের ও বেশী আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করি ও তওবা করি।{বুখারী শরীফ, হাদীস নং-৬৩০৭}
অন্য এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে- ‘আগার ইবনে ইয়াসার আল-মুযানী রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর। আমি প্রতিদিন ১০০ বার (আল্লাহর কাছ) তওবা করি।’ {ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩৮১৬}
মহানবী সা: অন্যত্র ইরশাদ করেছেন- ‘আনাস ইবনে মালেক রা: হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই নবী সা: বলেছেন, প্রত্যেক আদম সন্তান ভুল করে আর উত্তম ভুলকারী হলো যারা তওবা করে।'{তিরমিযি শরীফ, হাদীস নং-২৪৯৯}
উপরোল্লেখিত হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে
 মহানবী সা: নিষ্পাপ হওয়া স্বত্ত্বেও তওবা করতেন, উম্মতকে উহার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য।
 গোনাহ না থাকলেও তওবা করা যায়।
 ইস্তিগফার ও তওবা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত ।
 নবী সা: তাঁর উম্মতকে তওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
 তওবাকারী বান্দা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
তওবার প্রকারভদে: তওবা তিন প্রকার। যথা:
১)التوبة الصحيحة (আত্-তাওবাতুস সহীহাহ) আর তা হলো, বান্দা গোনাহকে স্বীকার করা, অত:পর তা হতে সত্যতার সাথে (তওবা করে)ফিরে আসা।
২) التوبة الأصح (আত্-তাওবাতুল আসাহাহ্) আর তা হলো তাওবাতুন নাসুহা ও তার আলামতসমূহ। বান্দা গুনাহকে অপছন্দ করা ও খারাপ মনে করা, যাতে হৃদয়ে পাপের উদ্রেগ না হয়। আর তার হৃদয়কে পাপসমূহ হতে পুত-পবিত্র রাখা।
৩) التوبة الفاسدة (আত্-তাওবাতুল ফাসিদা) আর তা হলো, হৃদয়ে পাপের স্বাদ ধরে রেখে কেবল মুখে মুখে তওবা করা।
যার হক নষ্ট করা হয়ছেে তার হকের বদলা দিয়ে বা তার কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
তওবায়ে নাসুহা তিনটি বিষয়ে সম্পর্কযুক্ত-
ক. সমস্ত অন্যায় অপরাধ হতে তওবা করা।
খ. তওবার উপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকা।
গ. তওবা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য হওয়া।
তওবার ফযিলত ও মাহাত্ম্য: মানুষ মাত্রই পাপ হওয়াটা স্বাভাবিক। সে পাপ মোচনের অন্যতম উপায় হল তওবা। কারণ এই তওবার মাধ্যমেই মহান আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ করা যায়। তাই বলা যায়, তওবার ফযিলত অপরিসীম, উহার ফায়েদাসমূহ অনেক, বরকতসমূহ বিভিন্ন প্রকার। নিম্নে কতিপয় ফযিলত বর্ণনা করা হল।
১.তওবা হল উভয় জাহানে সফলতা ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভের মাধ্যম।
আল্লাহ বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে সফলকাম হতে পার।’ { আন- নূর: ৩১}
২. তওবা হল পাপ মোচনের মাধ্যম। কেননা বান্দা যখন প্রকৃত তওবা করে তখন আল্লাহ তা‘আলা তার যাবতীয় পাপরাশি মোচন করে দেন।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা কর। (তাহলে) হয়তো তোমাদের প্রভু তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে জান্নাতে স্থান দিবেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত।’ { আত-তাহরীম:৮}
৩.তওবায় পাপ নেকীতে পরিণত হয়। বান্দা যখন উত্তমভাবে তওবা করে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার পাপকে নেকীর মাধ্যমে পরিবর্তন করে দেন।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- ‘তারা ব্যতীত যারা তওবা করে, বিশ্বাস রাখে এবং সৎ কাজ করে; আল্লাহ তাদের পাপসমূহ পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ { আল-ফুরকান: ৭০}
৪.তওবা হল ইত্তম উপঢৌকন, বৃষ্টি বর্ষণ, সন্তান-সন্ততি ও অর্থ সম্পদের মাধ্যমে সাহায্য ও শক্তি বৃদ্ধিও অন্যতম মাধ্যম।
আল্লাহ বলেন- ‘আর হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা চাও, তারপর তাঁর দিকে ফিরে আসো; তিনি আসমান থেকে তোমাদের জন্য বারিধারা বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি সাথে আরো শক্তি বাড়িয়ে দিবেন।‘ { হুদ: ৫২}
অন্যত্র নূহ আ.এর জবানে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- ‘বলেছি: তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তাহলে তিনি তোমাদের জন্য আকাশ হতে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন; ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা ও নদ-নদী বানিয়ে দিবেন।, { নূহ:১০-১২}
৫. আল্লাহ তা‘আলা তওবা ও তওবাকারীকে অধিক ভালবাসেন। ইবাদতসমূহের মধ্যে তওবা হল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তাই তিনি তওবা ও তওবাকারীকে অধিক পছন্দ করেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন, আর যারা পবিত্র থাকে তিনি তাদেরকেও ভালোবাসেন।’ { আল-বাক্বারাহ: ২২২}
৬.তওবা হল ক্ষমা ও রহমত প্রাপ্তির মাধ্যম। তওবার মাধ্যমেই ক্ষমা ও রহমত পাওয়া যায়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন- ‘তবে যারা খারাপ কাজ করার পর তওবা করে ও ঈমানদার হয়ে যায় তাদের ক্ষেত্রে (পরবর্তীতে) তোমার প্রভু অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ {‘আরাফ: ১৫৩}
৭. বান্দার আমল কবুল ও ক্ষমার অন্যতম মাধ্যম।
আল্লাহ বলেন- ‘তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং তাদের পাপসমূহ ক্ষমা করেন।’ { আশ-শুরা: ২৫}
৮. সমস্ত কল্যাণের মাধ্যম হল তওবা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন- ‘সুতরাং তারা যদি তওবা করে তাহলে তাদের জন্যই ভাল হবে।’ { আত-তওবা:৭৪}
৯.তওবা হল ঈমান ও উত্তম প্রতিদানের মাধ্যম।
আল্লাহ বলেন- ‘সেই সব লোক ব্যতীত যারা তওবা করে, নিজেদের সংশোধন করে, আল্লাহকে (আল্লাহর বিধানকে) আকড়ে ধরে এবং শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ধর্মে একনিষ্ট থাকে। এমন লোকেরা মুমিনদের সাথে থাকবে। আর আগামীতে আল্লাহ মুমিনদেরকে এক মহা প্রতিদান দিবেন।’ { আন-নিসা: ১৪৬}
১০.জাহান্নাম হতে মুক্তি ও জান্নাত প্রাপ্তির মাধ্যম।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন- ‘তবে যারা তওবা করেছে, সত্যকে বিশ্বাস করেছে এবং সৎকাজ করেছে তারা এর ব্যতিক্রম। এমন লোকেরা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি এতটুকু অবিচার করা হবে না।’ { মারইয়াম:৬০}
১১.তওবা হল আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী আনুগত্য করা।
আল্লাহ বলেন- ‘আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিতে চান।’ { আন-নিসা:২৭}
তওবা কখন করা চাই: গোনাহের এলাজ হল তওবা। নিজেকে ইছলাহ বা সংশোধন করতে হলে তওবার বিকল্প নাই। আমরা পাপ করতে করতে যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ি তখন মনে করি তওবার সময় হয়েছে। যা সম্পূর্ণ নিছক ধারনা মাত্র। পাপপ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই তওবা করা হল শ্রেষ্ঠ সময়। যাতে মৃত্যুশয্যায় শায়িত হওয়া পর্যন্ত বিলম্বিত না হয়। মনে রাখতে হবে, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তওবা করলে তা কবুল হয়না। তাই আমাদের উচিত মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসার পূর্বেই তওবা করা । নতুবা সে তওবা বিফলে যাবে।
মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- ‘এমন লোকদের তওবার সুযোগ নাই যারা (জীবনভর) খারাপ কাজ করতে থাকে; অবশেষে যখন তাদের করো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন বলে, ”আমি এখন তওবা করলাম;” তাদেরও তওবার সুযোগ নেই যারা কাফের অবস্থায় মারা যায়। এসব লোকদের জন্য আমি বেদনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।’ { আন-নিসা:১৮}
মনে রাখতে হবে পাপ হওয়ার সাথে সাথেই তওবা করা ওয়াজিব। কারণ পাপকে ঈমানের ক্ষতিকর ভাবা ঈমানেরই অংশ। তাই আমাদের উচিত যথা সময়ে তওবা করা।
সকলের জন্যই তওবা জরূরী: উভয় জাহানে কল্যাণ ও সফলতা লাভ করতে হলে সবার জন্যই তওবা জরূরী। আল্লাহ তা‘আলা তওবাকে সফলতার চাবিকাঠি বলে উলেখ করেছেন। সবাইকেই তওবার নির্দেশ দিয়েছেন। আসলে সুস্থ্য বিবেক সম্পন্ন প্রতিটি মানুষই তওবার গুরুত্ব বুঝে। কোনো বালেগ ব্যক্তি যদি মূর্খতা ও কুফুরীর মধ্যে থাকে তবে তার জন্য ওয়াজিব হল তা হতে তওবা কারা। জ্ঞান সম্পন্ন প্রতিটি মানুষের উপরই তওবা করা অপরিহার্য। এমন কোনো মানুষ নেই যার তওবা করার দরকার নেই। স্বয়ং মহানবী সা. যেখানে তওবা করেছেন ও তাঁর উম্মতকে উহার প্রতি আহবান করেছেন এতেই উহার গুরুত্ব অনুমেয় হয়। আল্লাহ তা‘আলার দরবারে নবী সা. এর ক্ষমা প্রার্থনার কারণেই আল্লাহ তাঁকে মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন- ‘যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের যাবতীয় ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন।’ { আল-ফাতাহ: ২}
তওবার যথার্থ দাবী হল অতীত পাপসমূহের ক্ষতিপূরণ করা ও ভবিষ্যতে নিন্দার সাথে তা পরিত্যাগ করা। আর বেশী বেশী নেক আমল করা।
নবী সা.ইরশাদ করেছেন- ‘বদ আমলের পরই নেক আমল কর। নেক আমল বদ আমলকে মিটিয়ে দিবে।’ { মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-২২০৩৯}
তওবায় গোনাহ মাফ : তওবায় যাবতীয় পাপরাশি মাফ হয়ে যায়। কেউ মনে প্রাণে তওবা করলে সে নিষ্পাপ হয়ে যায়।
মহানবী সা. ইরশাদ করেন- ‘আব্দুল্লাহ ইব মাসউদ রাযি. হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসূল সা. ইরশাদ করেন, পাপ হতে তওবাকারী ব্যক্তি হল ঐ ব্যক্তির ন্যায় যার কোন পাপ নেই।’ { ইবন মাজাহ,হাদীস নং-৪২৫০}
আর্থাৎ পাপ হতে তওবাকারী ব্যক্তি নিষ্পাপ শিশুর মত। তার জীবনের পাপরাশি বলতে কিছুই থাকেনা । তওবার বহু ঘটনা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্য হতে একটি হল-
‘আব্দুল্লাহ ইবন বুরাইদা রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সা, এর নিকট বসা ছিলাম। বনী গামেদের জনৈক মহিলা তাঁর নিকট আসলেন। অত:পর বললেন হে আল্লাহর রাসূল! সা. আমি যিনা করে ফেলেছি, আমি চাই আপনি আমাকে পবিত্র করে দেন। নবী সা. তাকে বললেন, তুমি ফিরে যাও । পরের দিন তাঁর কাছে যিনার স্বীকারোক্তি দিলেন। অত:পর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সা. আপনি আমাকে পবিত্র করুন। সম্ভবত আপনি আমাকে মায়ায ইবন মালেকের মত ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেন। আল্লাহর শপথ! আমি গর্ভবতী। নবী সা. তাকে বললেন, সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত সময়ের অবকাশ নিয়ে ফিরে যাও। অত:পর সন্তান ভূমিষ্ট করে, কাপড়ে পেচিয়ে নবী সা.এর কাছে নিয়ে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সা.আমি একে জন্ম দিয়েছি। নবী সা. বললেন, তুমি চলে যাও । আর শিশুকে দুধ পান করাও। অত:পর শিশুকে যখন দুধ পান করা ছাড়ানো হলো তখন তাকে নিয়ে আসলেন। শিশুটির হাতে রুটির টুকরো ছিল । মহিলা বললেন, হে আল্লাহর নবী সা. আমি ওকে দুধ পান ছাড়িয়ে দিয়েছি। নবী সা. শিশুকে কারো জিম্মায় নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। অত:পর জনৈক ব্যক্তি শিশুটির দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। অত:পর মহিলার জন্য একটি গর্ত খনন করা হল। তাতে তাকে বুক পর্যন্ত পুতে দেওয়া হল। এরপর নবী সা. লোকদের নির্দেশ দিলেন তাকে পাথর নিক্ষেপ করতে। খালিদ ইবন ওয়ালিদ রাযি. একটি পাথর নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে এসে মহিলার মাথায় নিক্ষেপ করলেন। তখন খালিদ ইবন ওয়ালিদ রাযি.এর গন্ডদেশে রক্ত ছিটকে আসলো। তিনি তাকে গালি দিলেন। নবী সা. তার গালি শুনতে পেয়ে বললেন, থামো হে খালিদ! তুমি তাকে গালি দিওনা। ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ। সে যথার্থ তওবা করেছে। যদি কোন জালিম ব্যক্তিও এমন তওবা করতো, অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো। অত:পর নবী সা. তার জানাযা পড়তে নির্দেশ দিলেন। তার জানাযা পড়ানো হল।{ মুসলিম শরীফ,হাদীস নং-৪৪০৬,৪৪০৭,৪৪০৮} মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল এর বর্ণনায় এসেছে, তাকে দাফন করা হয়ে ছিল।{ মুসনাদে আহমদ,হাদীস নং-২২৯৯৯}
পরিশেষে বলা যায় যে, উভয় জাহানে সফলতার স্বর্ণ শিকড়ে অধিষ্ঠিত হতে হলে তওবার প্রতি যথার্থ গুরুত্ব দেওয়া ও যত্নবান হওয়া অপরিহার্য।

লেখক: ইয়াছিন আল মাসুম, পিএইচডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।



No comments:

Post a Comment